ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল থেকে মানুষদের সরিয়ে নিন

৩৩টি রোহিঙ্গা শিবিরে পাহাড়ধসের ঝুঁকিতে থাকা মানুষের সংখ্যা প্রায় ৮০ হাজার। এর মধ্যে অতি ঝুঁকিপূর্ণ এক হাজার মানুষকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

Jul 8, 2026 - 09:55
 0  1
ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল থেকে মানুষদের সরিয়ে নিন

মৌসুমি নিম্নচাপ ও সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর কারণে চট্টগ্রাম বিভাগের জেলাগুলোয় ভারী ও অতি ভারী বৃষ্টি হচ্ছে। এরই মধ্যে কক্সবাজারের উখিয়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাহাড়ধসে সাতজন এবং রাঙামাটিতে একজনের মৃত্যু হয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস বলছে, দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে এ রকম বৃষ্টির প্রবণতা আরও এক সপ্তাহ অব্যাহত থাকতে পারে। অতীত অভিজ্ঞতা বলে, এ রকম টানা বৃষ্টি পাহাড়ধসসহ বড় মানবিক বিপর্যয় ঘটাতে পারে। সে ক্ষেত্রে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে নাগরিকদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে সরকারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।

প্রথম আলোর খবর জানাচ্ছে, রোববার দিবাগত রাতে উখিয়ার বালুখালী, কুতুপালং, জামতলি আশ্রয়শিবির ও কক্সবাজারে পৌর এলাকায় পৃথক পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে বালুখালী ও জামতলি আশ্রয়শিবিরে পাহাড়ধসে দুই পরিবারের সাতজন মারা যান। এ ধরনের দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় সবচেয়ে বেশি নাজুক অবস্থায় থাকেন মিয়ানমারের রাখাইন থেকে জাতিগত নিধনযজ্ঞ থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী। ২০১৭ সালের রোহিঙ্গা ঢলসহ নানা সময়ে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বর্তমানে ১৪ লাখ ছাড়িয়েছে। পাহাড় কেটে ও বনভূমি ধ্বংস করে বসতি গড়ে তোলায় রোহিঙ্গা শিবিরে পাহাড়ধস ও ট্র্যাজিক মৃত্যু প্রতিবছরের নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। কক্সবাজার বন ও পরিবেশ সংরক্ষণ পরিষদের তথ্য বলছে, গত ১০ বছরে সেখানে পাহাড়ধসে ১১৩ জনের প্রাণহানি হয়েছে।

৩৩টি রোহিঙ্গা শিবিরে পাহাড়ধসের ঝুঁকিতে থাকা মানুষের সংখ্যা প্রায় ৮০ হাজার। এর মধ্যে অতি ঝুঁকিপূর্ণ এক হাজার মানুষকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। আমরা মনে করি, ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে ঝুঁকিতে থাকা সবাইকেই নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়া প্রয়োজন।

শুধু রোহিঙ্গা শিবির নয়, চলমান দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে কক্সবাজার, চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের জেলাগুলোতেও। টানা বৃষ্টিতে চট্টগ্রাম নগরে সৃষ্টি হয়েছে জলাবদ্ধতা। কক্সবাজারের ৩৩ ইউনিয়ন প্লাবিত হয়েছে। পার্বত্য তিন জেলায় নদ–নদীর পানি বেড়েছে, আকস্মিক বন্যার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেল যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে। বৈরী আবহাওয়ায় শাহ আমানত বিমানবন্দরে কয়েকটি আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট নামতে পারেনি। খাগড়াছড়ি-রাঙামাটি সড়কের একাধিক স্থান তলিয়ে যাওয়ায় বন্ধ হয়ে গেছে সড়ক যোগাযোগ। বান্দরবানে আটকা পড়েছেন পর্যটকেরা।

নির্বিচার পাহাড় কাটা এবং প্রাকৃতিক বন উজাড় করা পাহাড়ধসের দুটি মূল কারণ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে স্থানীয় প্রজাতির গাছ কেটে পাহাড়গুলোতে সেগুনসহ নানা বনজ ও ফলদ গাছের বাগান করা হয়েছে। এ কারণে ক্রমাগতভাবে পাহাড়ের মাটি ক্ষয় হয়েছে ও পাহাড়গুলো নাজুক হয়ে পড়েছে। ফলে টানা ভারী বৃষ্টি হলেই পাহাড়ধস ও প্রাণহানি ঘটেই চলেছে।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাসেই যেহেতু বলা হচ্ছে আগামী কয়েক দিন এমন ভারী ও অতি ভারী বৃষ্টি অব্যাহত থাকতে পারে, সেহেতু দুর্যোগ মোকাবিলায় আগাম এবং সমন্বিত প্রস্তুতি ও সতর্কতা এ মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি জরুরি। গত দুই দশকে পাহাড়ধসে বড় বড় যেসব মানবিক বিপর্যয় তৈরি হয়েছে, তার সিংহভাগই ঘটেছে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙামাটি ও বান্দরবান জেলায়। এর মধ্যে ২০০৭ সালে পাহাড়ধসে ১০৭ জন এবং ২০১৭ সালে প্রায় ১৬০ জনের প্রাণহানি হয়।

অতীত অভিজ্ঞতা বলে, প্রশাসন আগেভাগে সতর্ক হলে এবং ব্যবস্থা নিলে পাহাড়ধসে প্রাণহানির ঘটনা কমে আসে। আমরা মনে করি, এ ক্ষেত্রে মাইকিং করে সতর্ক করাটাই যথেষ্ট নয়, বাধ্যতামূলকভাবে নাগরিকদের নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নেওয়া প্রয়োজন। বন্যা ও বন্যা–পরবর্তী পুনর্বাসনের ক্ষেত্রেও সরকারকে নজর দিতে হবে।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow