লিওনেল মেসি, যাকে বহন করে গোটা একটি প্রজন্ম
শেষ বাঁশি বাজতেই মাঠে শুরু হলো উদযাপন। ট্রফি নেই, ফাইনালও নয়। তবু আর্জেন্টিনার ফুটবলাররা যেন পৃথিবীকে জানিয়ে দিলেন- কিছু মানুষকে সম্মান জানানোর জন্য শিরোপার প্রয়োজন হয় না। এক মুহূর্তে লিওনেল মেসি মাটি ছেড়ে উঠে গেলেন আকাশে। অসংখ্য হাত তাকে তুলে দিল শূন্যে। নিচে সতীর্থদের মুখে উচ্ছ্বাস, চোখে গর্ব। আর মাঝ আকাশে ভাসতে থাকা ৩৯ বছর বয়সী মানুষটির মুখে সেই চেনা শিশুসুলভ হাসি। ছবিটি যেন ফুটবলের সবচেয়ে সুন্দর সত্যগুলোর একটি বলে দেয়- কিছু মানুষকে শুধু ভালো খেলার জন্য নয়, মানুষ হিসেবে অসাধারণ হওয়ার কারণেও ভালোবাসা হয়। বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে কিংবদন্তির অভাব নেই। পেলে, ম্যারাডনা , ক্রইফ, জিদান কিংবা ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো- প্রত্যেকেই নিজেদের মহত্ত্বের গল্প লিখেছেন। কিন্তু লিওনেল মেসিকে নিয়ে আলাদা করে এমন একটি বিষয় আছে, যা পরিসংখ্যান দিয়ে মাপা যায় না। সেটি হলো, সতীর্থদের নিঃশর্ত ভালোবাসা এবং অগাধ শ্রদ্ধা। মেসিকে কখনো চিৎকার করে নেতৃত্ব দিতে দেখা যায় না। তিনি বক্তৃতা দিয়ে ড্রেসিংরুম দখল করেন না। তার নেতৃত্বের ভাষা অন্যরকম। তিনি বল পায়ে সামনে থেকে পথ দেখান, অনুশীলনে সবচেয়ে বেশি পরিশ্রম করেন, জয় ভাগ করে নেন সবার সঙ্গে আর পরাজয়ের দায় নেন নিজের কাঁধে। আধুনিক ফুটবলে এমন নেতৃত্ব খুব বেশি দেখা যায় না। আর্জেন্টিনার বর্তমান দলের বেশিরভাগ ফুটবলারই ছোটবেলায় মেসির খেলা দেখে বড় হয়েছেন। হুলিয়ান আলভারেজ, এনজো ফার্নান্দেজ, অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার, নাহুয়েল মোলিনা কিংবা থিয়াগো আলমাদাদের কাছে মেসি প্রথমে ছিলেন টেলিভিশনের নায়ক, পরে ড্রেসিংরুমের অধিনায়ক। তাদের কাছে তিনি কেবল বিশ্বের সেরা ফুটবলার নন; এমন একজন মানুষ, যার সঙ্গে একই জার্সি পরে খেলাটাই একসময় ছিল কল্পনার বিষয়। সে কারণেই আর্জেন্টিনার ড্রেসিংরুমে মেসির সঙ্গে সম্পর্কটা অধিনায়ক ও খেলোয়াড়ের সীমায় আটকে নেই। এটি অনেকটা পথপ্রদর্শক কিংবা অভিভাবকের মতো। নতুন কেউ দলে এলে তাকে স্বস্তি দিতে এগিয়ে আসেন মেসি। তরুণদের ভুলে বিরক্ত হওয়ার বদলে উৎসাহ দেন। ম্যাচে গোল করলেও উদযাপনে সতীর্থদের সামনে ঠেলে দেন। আলোটা নিজের ওপর রাখতে তিনি কখনোই আগ্রহী নন। অথচ এই মানুষটিকেই একসময় নিজের দেশের সমর্থকদের কঠিন সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছিল। টানা তিনটি ফাইনাল হেরে জাতীয় দল থেকে অবসরের ঘোষণাও দিয়েছিলেন; কিন্তু ফিরেও এসেছিলেন। কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন, আর্জেন্টিনার জন্য লড়াই শেষ হয়নি। সেই প্রত্যাবর্তনের পরই বদলে যায় ইতিহাস। কোপা আমেরিকা, ফাইনালিসিমা, তারপর বিশ্বকাপ- দীর্ঘ অপেক্ষার প্রতিটি স্বপ্ন পূরণ করেন তিনি। এই সাফল্যগুলো শুধু ট্রফির সংখ্যা বাড়ায়নি, বদলে দিয়েছে আর্জেন্টিনা দলের সংস্কৃতিও। এখন এই দলটি ব্যক্তিনির্ভর নয়, পরিবারনির্ভর। আর সেই পরিবারের কেন্দ্রবিন্দু মেসি। মিশরের বিপক্ষে ম্যাচ শেষে তাকে আকাশে ছুড়ে তোলার দৃশ্যটি তাই নিছক উচ্ছ্বাস ছিল না। এটি ছিল এক ধরনের সম্মাননা। ফুটবলাররা যেন প্রতীকী ভাষায় বলছিলেন, ‘এতদিন আপনি আমাদের কাঁধে তুলে এনেছেন, এবার আপনাকে বহন করার দায়িত্ব আমাদের।’ এমন দৃশ্য সাধারণত দেখা যায় বিদায়ী ম্যাচে কিংবা বড় কোনো শিরোপা জয়ের পর; কিন্তু এখানে কোনো বিদায় ছিল না, কোনো ট্রফিও ছিল না। তবু সতীর্থদের কাছে মুহূর্তটি এতটাই গুরুত্বপূর্ণ ছিল যে, তারা উদযাপনের কেন্দ্রবিন্দুতে রেখেছে একজন মানুষকে, যিনি বছরের পর বছর নিজের ব্যক্তিগত অর্জনের চেয়ে দলকে বড় করে দেখিয়েছেন। হয়তো এ কারণেই মেসিকে নিয়ে প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়দের মধ্যেও একই রকম শ্রদ্ধা দেখা যায়। ম্যাচ শেষে জার্সি বদল করা, ছবি তোলা কিংবা সন্তানদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার দৃশ্য এখন প্রায় নিয়মিত। কারণ সবাই জানে, তারা শুধু একজন অসাধারণ ফুটবলারের মুখোমুখি নয়; তারা এমন একজন ক্রীড়াবিদের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন, যিনি প্রতিভা, বিনয় এবং মানবিকতার এক বিরল সমন্বয়। ফুটবলে গোল, ট্রফি আর রেকর্ড একদিন ভেঙে যায়। নতুন নায়ক আসে, নতুন ইতিহাস লেখা হয়। কিন্তু মানুষকে যেভাবে স্পর্শ করা যায়, তার কোনো বিকল্প নেই। মেসির সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার হয়তো তার গোলসংখ্যা নয়, বরং এমন একটি প্রজন্ম তৈরি করা, যারা তাকে ভয় পায় না, ঈর্ষাও করে না; বরং হৃদয়ের গভীর থেকে ভালোবাসে। মিশর-আর্জেন্টিনা ম্যাচের পরের ছবিটি তাই শুধু একজন ফুটবলারের আকাশে ভেসে ওঠার ছবি নয়। এটি এমন এক নেতার প্রতিচ্ছবি, যিনি সতীর্থদের কাছে কিংবদন্তি হওয়ার আগেই একজন প্রিয় মানুষ হয়ে উঠেছেন। আর হয়তো এ কারণেই লিওনেল মেসিকে কখনো একা হাঁটতে হয় না- কারণ তাকে বহন করার জন্য সবসময়ই প্রস্তুত থাকে অসংখ্য হাত, আর তাকে ভালোবাসার জন্য প্রস্তুত থাকে কোটি কোটি হৃদয়। টিটিটি/আইএইচএস/
শেষ বাঁশি বাজতেই মাঠে শুরু হলো উদযাপন। ট্রফি নেই, ফাইনালও নয়। তবু আর্জেন্টিনার ফুটবলাররা যেন পৃথিবীকে জানিয়ে দিলেন- কিছু মানুষকে সম্মান জানানোর জন্য শিরোপার প্রয়োজন হয় না।
এক মুহূর্তে লিওনেল মেসি মাটি ছেড়ে উঠে গেলেন আকাশে। অসংখ্য হাত তাকে তুলে দিল শূন্যে। নিচে সতীর্থদের মুখে উচ্ছ্বাস, চোখে গর্ব। আর মাঝ আকাশে ভাসতে থাকা ৩৯ বছর বয়সী মানুষটির মুখে সেই চেনা শিশুসুলভ হাসি।
ছবিটি যেন ফুটবলের সবচেয়ে সুন্দর সত্যগুলোর একটি বলে দেয়- কিছু মানুষকে শুধু ভালো খেলার জন্য নয়, মানুষ হিসেবে অসাধারণ হওয়ার কারণেও ভালোবাসা হয়।
বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে কিংবদন্তির অভাব নেই। পেলে, ম্যারাডনা , ক্রইফ, জিদান কিংবা ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো- প্রত্যেকেই নিজেদের মহত্ত্বের গল্প লিখেছেন। কিন্তু লিওনেল মেসিকে নিয়ে আলাদা করে এমন একটি বিষয় আছে, যা পরিসংখ্যান দিয়ে মাপা যায় না। সেটি হলো, সতীর্থদের নিঃশর্ত ভালোবাসা এবং অগাধ শ্রদ্ধা।
মেসিকে কখনো চিৎকার করে নেতৃত্ব দিতে দেখা যায় না। তিনি বক্তৃতা দিয়ে ড্রেসিংরুম দখল করেন না। তার নেতৃত্বের ভাষা অন্যরকম। তিনি বল পায়ে সামনে থেকে পথ দেখান, অনুশীলনে সবচেয়ে বেশি পরিশ্রম করেন, জয় ভাগ করে নেন সবার সঙ্গে আর পরাজয়ের দায় নেন নিজের কাঁধে। আধুনিক ফুটবলে এমন নেতৃত্ব খুব বেশি দেখা যায় না।
আর্জেন্টিনার বর্তমান দলের বেশিরভাগ ফুটবলারই ছোটবেলায় মেসির খেলা দেখে বড় হয়েছেন। হুলিয়ান আলভারেজ, এনজো ফার্নান্দেজ, অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার, নাহুয়েল মোলিনা কিংবা থিয়াগো আলমাদাদের কাছে মেসি প্রথমে ছিলেন টেলিভিশনের নায়ক, পরে ড্রেসিংরুমের অধিনায়ক। তাদের কাছে তিনি কেবল বিশ্বের সেরা ফুটবলার নন; এমন একজন মানুষ, যার সঙ্গে একই জার্সি পরে খেলাটাই একসময় ছিল কল্পনার বিষয়।
সে কারণেই আর্জেন্টিনার ড্রেসিংরুমে মেসির সঙ্গে সম্পর্কটা অধিনায়ক ও খেলোয়াড়ের সীমায় আটকে নেই। এটি অনেকটা পথপ্রদর্শক কিংবা অভিভাবকের মতো। নতুন কেউ দলে এলে তাকে স্বস্তি দিতে এগিয়ে আসেন মেসি। তরুণদের ভুলে বিরক্ত হওয়ার বদলে উৎসাহ দেন। ম্যাচে গোল করলেও উদযাপনে সতীর্থদের সামনে ঠেলে দেন। আলোটা নিজের ওপর রাখতে তিনি কখনোই আগ্রহী নন।
অথচ এই মানুষটিকেই একসময় নিজের দেশের সমর্থকদের কঠিন সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছিল। টানা তিনটি ফাইনাল হেরে জাতীয় দল থেকে অবসরের ঘোষণাও দিয়েছিলেন; কিন্তু ফিরেও এসেছিলেন। কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন, আর্জেন্টিনার জন্য লড়াই শেষ হয়নি। সেই প্রত্যাবর্তনের পরই বদলে যায় ইতিহাস। কোপা আমেরিকা, ফাইনালিসিমা, তারপর বিশ্বকাপ- দীর্ঘ অপেক্ষার প্রতিটি স্বপ্ন পূরণ করেন তিনি।
এই সাফল্যগুলো শুধু ট্রফির সংখ্যা বাড়ায়নি, বদলে দিয়েছে আর্জেন্টিনা দলের সংস্কৃতিও। এখন এই দলটি ব্যক্তিনির্ভর নয়, পরিবারনির্ভর। আর সেই পরিবারের কেন্দ্রবিন্দু মেসি।
মিশরের বিপক্ষে ম্যাচ শেষে তাকে আকাশে ছুড়ে তোলার দৃশ্যটি তাই নিছক উচ্ছ্বাস ছিল না। এটি ছিল এক ধরনের সম্মাননা। ফুটবলাররা যেন প্রতীকী ভাষায় বলছিলেন, ‘এতদিন আপনি আমাদের কাঁধে তুলে এনেছেন, এবার আপনাকে বহন করার দায়িত্ব আমাদের।’
এমন দৃশ্য সাধারণত দেখা যায় বিদায়ী ম্যাচে কিংবা বড় কোনো শিরোপা জয়ের পর; কিন্তু এখানে কোনো বিদায় ছিল না, কোনো ট্রফিও ছিল না। তবু সতীর্থদের কাছে মুহূর্তটি এতটাই গুরুত্বপূর্ণ ছিল যে, তারা উদযাপনের কেন্দ্রবিন্দুতে রেখেছে একজন মানুষকে, যিনি বছরের পর বছর নিজের ব্যক্তিগত অর্জনের চেয়ে দলকে বড় করে দেখিয়েছেন।
হয়তো এ কারণেই মেসিকে নিয়ে প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়দের মধ্যেও একই রকম শ্রদ্ধা দেখা যায়। ম্যাচ শেষে জার্সি বদল করা, ছবি তোলা কিংবা সন্তানদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার দৃশ্য এখন প্রায় নিয়মিত। কারণ সবাই জানে, তারা শুধু একজন অসাধারণ ফুটবলারের মুখোমুখি নয়; তারা এমন একজন ক্রীড়াবিদের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন, যিনি প্রতিভা, বিনয় এবং মানবিকতার এক বিরল সমন্বয়।
ফুটবলে গোল, ট্রফি আর রেকর্ড একদিন ভেঙে যায়। নতুন নায়ক আসে, নতুন ইতিহাস লেখা হয়। কিন্তু মানুষকে যেভাবে স্পর্শ করা যায়, তার কোনো বিকল্প নেই। মেসির সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার হয়তো তার গোলসংখ্যা নয়, বরং এমন একটি প্রজন্ম তৈরি করা, যারা তাকে ভয় পায় না, ঈর্ষাও করে না; বরং হৃদয়ের গভীর থেকে ভালোবাসে।
মিশর-আর্জেন্টিনা ম্যাচের পরের ছবিটি তাই শুধু একজন ফুটবলারের আকাশে ভেসে ওঠার ছবি নয়। এটি এমন এক নেতার প্রতিচ্ছবি, যিনি সতীর্থদের কাছে কিংবদন্তি হওয়ার আগেই একজন প্রিয় মানুষ হয়ে উঠেছেন। আর হয়তো এ কারণেই লিওনেল মেসিকে কখনো একা হাঁটতে হয় না- কারণ তাকে বহন করার জন্য সবসময়ই প্রস্তুত থাকে অসংখ্য হাত, আর তাকে ভালোবাসার জন্য প্রস্তুত থাকে কোটি কোটি হৃদয়।
টিটিটি/আইএইচএস/
What's Your Reaction?